সাম্প্রতিক সময়ে বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদের দিঘিতে কুমিরের হাতে একটি কুকুরের করুণ মৃত্যুর ভিডিও দেখে যখন সারা দেশের মানুষ শোকাতুর, ঠিক তখনই এস্টাব্লিশমেন্ট বা আমলাতন্ত্র তাদের জাদুর কাঠি বের করল। তারা বলতে শুরু করল, "কুকুরটি আসলে নিরপরাধ ছিল না!" তাদের দাবি অনুযায়ী, কুকুরটি নাকি এলাকায় মানুষ কামড়ে বেড়াত এবং ঘটনার দিন সে 'নিজের ইচ্ছায়' বা 'দুর্ঘটনাজনিত কারণে' পানিতে পড়ে গিয়ে কুমিরের মুখে ধরা দিয়েছে।

অর্থাৎ, কুমিরটি সেখানে কোনো শিকারি নয়, বরং একজন 'নিরাপত্তা প্রহরী' হিসেবে কাজ করছিল! ভাবখানা এমন যে, কুকুরটি নিজেই কুমিরকে ইনভাইটেশন কার্ড পাঠিয়ে বলেছিল— "ভাই, আমি অনেক পাপিষ্ঠ, আমাকে খেয়ে ধন্য করো।" একটি অবলা প্রাণীর এমন করুণ মৃত্যুকে জাস্টিফাই করার জন্য কুকুরের চরিত্রে কালি লেপন করা সম্ভবত এই শতকের সেরা হিউমার।

প্রথম ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং হৃদয়বিদারক। একটি প্রাণীর এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু মানবিক চোখে মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু যখন দেখবেন সরকার বা আমলারা ঘটনাটির কোনো যৌক্তিক সমাধান না খুঁজে নিজেদের দায় এড়াতে এমন সব ব্যাখ্যা দাঁড় করান যা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানকে হার মানায়, তখন আপনি স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পাবেন না।

এটা মূলত দেশবাসীর ওপর এক ধরণের 'ডাবল ট্যাপ' আক্রমণ। আপনি ইতিমধ্যে শোকে আক্রান্ত ও ক্ষুব্ধ; আপনি যখন প্রতিবাদ গুছিয়ে নিচ্ছেন, ঠিক তখনই আপনার ওপর দ্বিতীয় আঘাতটি আসবে। এমন এক ব্যাখ্যা বা সাজানো ঘটনা সামনে আনা হবে যা আপনার বাকরুদ্ধ করে দেবে। আপনি ভাবতে বাধ্য হবেন— আমলাদের এই "আষাঢ়ে গল্প" কি কেবল "যুক্তিহীনতার দাপট" নাকি আমাদের জন্য চরম এক "ইন্টেলেকচুয়াল ইনসাল্ট" বা বুদ্ধিবৃত্তিক অপমান?

একই নাটকের পুনরাবৃত্তি আমরা দেখেছিলাম ডিসি মাসুদের ঘটনায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করার অভিযোগ উঠল তাঁর বিরুদ্ধে। মানুষ যখন সেই ঘটনায় ফুঁসে উঠল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে বদল ঘটল। দেখা গেল, সেই একই পুলিশ কর্মকর্তা কোনো এক রহস্যময় অপহৃত শিশুকে উদ্ধার করে বীরদর্পে হাজির হলেন! অথচ সেই কথিত অপহরণের কোনো গোড়া নেই, নেই কোনো গ্রেপ্তার।

প্রথম ঘটনাটি ছিল একটি নিষ্ঠুরতা—যা আমাদের ক্ষুব্ধ করে। আর দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটানো হলো আমাদের মগজ ও বিবেকের ওপর চপেটাঘাত হিসেবে। প্রশাসন সম্ভবত ধরে নিয়েছে যে, সাধারণ মানুষ এতটাই বিচারবুদ্ধিহীন যে যেকোনো নিম্নমানের স্ক্রিপ্ট তাদের গেলানো সম্ভব।

আমরা প্রথম 'ট্যাপে' মানসিক ব্যথা পাই, আর দ্বিতীয় 'ট্যাপে' আমাদের বিচারবোধ ভোঁতা হয়ে যায়। প্রথম অপরাধের ক্ষত শুকানোর আগেই দ্বিতীয় ধাপের অবিশ্বাস্য বয়ান আমাদের স্তব্ধ করে দেয়। এটাই যেন এখনকার সময়ের নতুন সামাজিক নিয়তি।